আইন-আদালত

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তার রোমহর্ষক সাক্ষ্য

  বাংলাদেশ প্রতিদিন 18 September 2026 , 2:38:13

শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক সাক্ষ্য দিয়েছেন র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এই জবানবন্দিতে তিনি জানান, ২০১০ সালের মে মাসে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলামসহ চারজনকে এবং বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সরকারের সমালোচক হিসেবে চিহ্নিত অন্তত ১৫ জন ভিকটিমকে গুলি করে হত্যার পর পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

এসব হত্যাকাণ্ডকে জিয়াউল আহসান সাংকেতিক ভাষায় বলতেন ‘গলফ অপারেশন’। মামলাটির একমাত্র আসামি সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক ও র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিচালক জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

জবানবন্দি গ্রহণের পরে চিফ প্রসিকিউটর মো.আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, জিয়াউল আহসানের দ্বারা সংগঠিত এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন মেজর (অব.) সাব্বির। আর তার এই জবানবন্দিই জিয়াউলের অপরাধ প্রমাণে যথেষ্ট বলে মনে করেন তিনি।

জবানবন্দিতে মেজর সাব্বির জানান, ১৯৯৩ সালে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া কোরে কমিশন পাওয়ার পর ২০০৯ সালে র‌্যাবে বদলি হন তিনি। প্রথমে র‌্যাব-২ এবং পরে র‌্যাব-৮-এর উপ-অধিনায়ক হিসেবে বরিশালে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান।

তার দাবি, জিয়াউল আহসান বিভিন্ন সময় র‌্যাব-৮-এর অধিনায়ক ও তাকে সরাসরি ফোন করে বিভিন্ন আভিযানিক নির্দেশনা দিতেন। সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের জানুয়ারির দিকে এক রাতে জিয়াউল আহসান সরকারি গাড়ি ও মাইক্রোবাস নিয়ে র‌্যাব-৮-এর বরিশাল সদর দপ্তরে যান। পরে তাকে ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়ককে সঙ্গে নিয়ে পাথরঘাটার চরদুয়ানী ঘাটে যান। সেখানে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা আগে থেকেই একটি ট্রলার প্রস্তুত করে রেখেছিলেন।

মেজর সাব্বির বলেন, ঢাকা থেকে আসা গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা ট্রলারে ওঠার সময় একজন ব্যক্তিকেও হাত বাঁধা ও মাথায় কালো টুপি পরানো অবস্থায় ট্রলারে তোলা হয়। ওই ব্যক্তিকে ট্রলারের মাছ সংরক্ষণের খোলে রাখা হয়। পরে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে ট্রলার মোহনার দিকে নেওয়া হয়। পানির গভীরতা মাপার পর ওই ব্যক্তিকে খোল থেকে বের করে আনা হয়।

জবানবন্দিতে সাব্বির দাবি করেন, চার র‌্যাব সদস্য ওই ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলেন। একজন তার গলা ও পায়ের কাছে দুটি সিমেন্টের বস্তা বাঁধেন। আরেকজন মাথা ও কানের পাশে ছোট বালিশ ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে গুলি করেন। এরপর আরেক সদস্য তার পেট কেটে দেন এবং অপর একজন পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে তা পরীক্ষা করেন।

পরে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে সিমেন্টের বস্তাসহ মরদেহ পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনার পর বরিশালে ফেরার পথে পরিবেশ স্বাভাবিক করতে জিয়াউল আহসান ওই ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেন এবং তাদের ‘গলফ’ করতে হবে বলে জানান—এমন দাবি করেন সাব্বির।

পরে র‌্যাব-৮-এর অধিনায়ককে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন তারা এ ঘটনায় অংশ নিলেন। অধিনায়ক তাকে বলেন, জিয়াউল আহসানের নির্দেশের বাইরে তার কিছু করার ছিল না এবং বিষয়টি র‌্যাব সদর দপ্তরে জানাবেন।

‘চারজনকে হত্যার বর্ণনা’

২০১০ সালের মে মাসের আরেকটি অভিযানের সময় জিয়াউল আহসান দুটি মাইক্রোবাস নিয়ে র‌্যাব-৮ সদর দপ্তরে আসেন। পরে তাকে ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়ককে সঙ্গে নিয়ে আবার চরদুয়ানী ঘাটে যান।

সাক্ষী বলেন, ওই অভিযানে চারজন ব্যক্তিকে হাত পেছনে বাঁধা ও মাথায় কালো টুপি পরানো অবস্থায় ট্রলারে তোলা হয়। তাদের এমনভাবে ঢেকে রাখা হয়েছিল, যাতে তারা পুরুষ না নারী—তা বোঝার উপায় ছিল না। একে একে তাদের ট্রলারের খোলে ঢোকানো হয়। পরে মোহনার দিকে নিয়ে গিয়ে প্রথম ব্যক্তিকে বের করে একই প্রক্রিয়ায় হত্যা করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

সাব্বিরের ভাষ্য অনুযায়ী, একইভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যক্তিকেও হত্যা করা হয়। চতুর্থ ব্যক্তিকে খোল থেকে বের করতে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। পরে তাকে বের করে গলায় ও পায়ে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা হয়, মাথা ও কানের পাশে বালিশ ঠেকিয়ে গুলি করা হয় এবং পেট কেটে সিমেন্টের বস্তাসহ পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।

‘বলেশ্বরে ভেসে ওঠে পেট কাটা লাশ’

সাক্ষীর দাবি, এ ঘটনার দুই-তিন দিনের মধ্যে শরনখোলা রেঞ্জের বলেশ্বর নদীতে মুখ ঢাকা, পেট কাটা ও শরীরে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা একটি লাশ ভেসে ওঠার খবর পান তিনি। কয়েক মাস পর গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, ডিএনএ পরীক্ষায় ওই লাশটি সাবেক বিজিবি সদস্য নজরুল ইসলামের বলে শনাক্ত হয়েছে।

আলকাছ মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ করার নির্দেশ’

২০১১ সালের জুনের দিকে জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে আলকাছ মাঝির বিষয়ে জানতে চান বলে জানান সাব্বির। তার দাবি, আলকাছ ‘গলফ অভিযানে’ ব্যবহৃত ট্রলারের অন্যতম মাঝি ছিলেন। জিয়াউল আহসান তাকে জানান, আলকাছ চরদুয়ানী বাজারে এসব অভিযান সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য বলে বেড়াচ্ছেন, যা র্যাবের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে।

সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর জিয়াউল আহসান তাকে আলকাছকে ‘এলিমিনেট’ (নির্মূল) করার নির্দেশ দেন। সাব্বির অসুস্থতার কথা বলে দায়িত্ব পালনে অপারগতা জানালে জিয়াউল আহসান বলেন, ‘থাক, লাগবে না।’ পরে তিনি বিষয়টি তার অধিনায়ককে জানান।

এর প্রায় এক সপ্তাহ পর আলকাছের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা র‌্যাব-৮ সদর দপ্তরে আসেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সাব্বির। আলকাছের স্ত্রী জানান, কয়েক দিন আগে জিয়াউল আহসানের কথা বলে ফোন করে আলকাছকে ডেকে নেওয়া হয়। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আলকাছ তার স্ত্রীকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। সাক্ষীর দাবি, বিষয়টি শুনে তিনি ও তার অধিনায়ক আলকাছের পরিণতি সম্পর্কে ধারণা করেছিলেন।

‘গলফ অভিযান’-এর প্যাটার্ন

সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় তিনি এসব অভিযানের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন দেখতে পান। তার দাবি, ‘গলফ’র জন্য আটক ব্যক্তিদের পরিচয় জিয়াউল আহসান ছাড়া অন্যরা জানতেন না। তাদের এমনভাবে পরিবহন করা হতো, যাতে তাদের শারীরিক গঠন বা পরিচয় বোঝা না যায়। অধিকাংশের খালি পা থাকত।

জবানবন্দিতে তিনি আরও দাবি করেন, কালো টুপি, সিমেন্টের বস্তা, রশিসহ এসব অভিযানে ব্যবহৃত সরঞ্জাম র‌্যাব-৮-এ সংযুক্ত সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা প্রস্তুত করতেন। তার জানা মতে, বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে জিয়াউল আহসান প্রায় ১৫ থেকে ২০ বার এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করেছেন।

এদিকে, সাক্ষীর জবানবন্দি শেষে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, জিয়াউল হাসানের মামলায় সাক্ষীর সাক্ষ্য থেকে অভিযানের ধরন, ভিকটিমদের হত্যা এবং লাশ গুম করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

তার দাবি, আসামির সঙ্গে সাক্ষীর ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না; বরং তিনি একই বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন এবং অনুশোচনা থেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর তার সাক্ষীর উপর ভিত্তি করে আমার মনে হয় যে, জিয়াউল হাসানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষের, সেটি প্রমাণের জন্য যথেষ্ট সহায়ক।

আরও খবর:

Sponsered content