ফিচার

প্রকৃতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ: শিক্ষার্থীদের চোখে বিশ্ব পরিবেশ দিবস

  বাংলাদেশ প্রতিদিন 5 June 2026 , 11:51:34

প্রকৃতি ও পরিবেশ মানবজীবনের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, বন উজাড় ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে পরিবেশ আজ গুরুতর হুমকির মুখে। এই সংকট মোকাবিলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতি বছর ৫ জুন পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব। বিশ্ব পরিবেশ দিবস সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের এমন মতামত তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারদিন মোহাম্মদ।

১. সবুজ পৃথিবীই হোক আগামী প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ উপহার

প্রকৃতি আমাদের অস্তিত্বের একমাত্র আশ্রয়স্থল। অথচ উন্নয়নের অন্ধ প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে পরিবেশ। কমছে বনভূমি, বাড়ছে দূষণ, উষ্ণ হয়ে উঠছে পৃথিবী। এরই ফল হিসেবে ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবী শুধু আমাদের নয় এটি আগামী প্রজন্মেরও। তাই প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একটি গাছ রোপণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো কিংবা পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তোলার মতো ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। আজ আমরা যে পৃথিবী রেখে যাব, আগামী প্রজন্ম সেই পৃথিবীতেই বাঁচবে, স্বপ্ন দেখবে, ভবিষ্যৎ গড়বে। তাই আসুন, পরিবেশ রক্ষাকে শুধু একটি দিবসের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের অঙ্গ করে তুলি। কারণ আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান যে সম্পদ রেখে যেতে পারি, তা কোনো ধন-সম্পদ নয় বরং তা হলো একটি সবুজ, নির্মল ও বাসযোগ্য পৃথিবী।

শাহিদা জাহান ইরানী,
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড জিওগ্রাফি
বিভাগ, ইবি।

২. পরিবেশের সুস্থতাই মানবকল্যাণের ভিত্তি

বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের বিপর্যয়, বায়ু ও পানি দূষণ, বনভূমি ধ্বংস এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহারের মতো বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। এসব সংকট প্রকৃতির ভারসাম্য বিপন্ন এর পাশাপাশি মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নকেও হুমকির সম্মুখীন করছে। তাই উন্নয়নের ধারাকে টেকসই করতে হলে পরিবেশের সঙ্গে সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। একজন পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, পরিবেশ রক্ষার সংগ্রাম কেবল নীতিনির্ধারক বা গবেষকদের একার দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের প্রতিটি মানুষের সম্মিলিত কর্তব্য। পরিবেশগত সচেতনতা, দায়িত্বশীল ভোগ, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা একটি সবুজ ও নিরাপদ পৃথিবী বিনির্মাণ করতে পারি। আমরা যদি প্রকৃতিকে কেবল সম্পদের উৎস হিসেবে না দেখে জীবন ও সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে মূল্যায়ন করি, তবে পরিবেশ সংরক্ষণের পথ আরও সুদৃঢ় হবে। কারণ প্রকৃতির সুস্থতা এবং মানবকল্যাণ একে অপরের পরিপূরক; একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির স্থায়িত্ব অসম্ভব।

মোঃ রবিউস সানি জোহা
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড জিওগ্রাফী বিভাগ, ইবি।

৩. প্রকৃতি বাঁচুক, ভবিষ্যৎ বাঁচুক

প্রকৃতি আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু আধুনিক জীবনযাত্রা ও মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য দিন দিন নষ্ট হচ্ছে। এ বাস্তবতায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের সচেতন হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্বের বিষয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের ফলে আজ প্রকৃতি চরম হুমকির মুখে। তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনে নয়, বছরের প্রতিটি দিন পরিবেশের প্রতি সচেতন ও দায়িত্বশীল আচরণ করা আমাদের কর্তব্য। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি।

স্মিথ জাহান বিভা
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ইবি।

৪. সবুজ পৃথিবীর স্বপ্নে পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার

প্রকৃতি কখনো আমাদের কাছে কিছু চায় না, অথচ অকৃপণ হাতে দিয়ে যায় জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণ। ভোরের নির্মল বাতাস, পাখির মধুর কলতান, নদীর কলকল ধ্বনি কিংবা বৃক্ষের শীতল ছায়া—সবই প্রকৃতির নিঃস্বার্থ উপহার। প্রকৃতির এই অপরিসীম দানে আমাদের জীবন সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আধুনিকতার মোহে আমরা দিন দিন প্রকৃতির কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, পরিবেশ দূষণ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে প্রকৃতি আজ নীরবে তার ক্ষতচিহ্ন বহন করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বৃদ্ধির মাধ্যমে সেই ক্ষতির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের প্রকৃতির সেই নীরব আর্তনাদ উপলব্ধি করতে শেখায়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং সহাবস্থানই মানব সভ্যতার টিকে থাকার একমাত্র পথ। পরিবেশ রক্ষা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের দায়িত্ব ও সচেতনতার অংশ হওয়া উচিত। তাই আসুন, আমরা প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখি এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের অভ্যাসে পরিণত করি। বৃক্ষরোপণ, দূষণ কমানো এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা একটি সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি। কারণ আজ আমরা যে পৃথিবীর যত্ন নেব, আগামী প্রজন্ম সেই পৃথিবীতেই তাদের স্বপ্নের ঠিকানা খুঁজে পাবে। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসাই হোক আমাদের আগামী দিনের সবচেয়ে বড়

মোঃ ইসতিয়াক আহম্মদ আসিফ,
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোবিপ্রবি।

৫. পরিবেশ রক্ষায় একাত্ম হই।

পরিবেশ আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ। আমাদের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সকল উপাদান আমরা পরিবেশ থেকে পাই। আবার আমরা বিভিন্নভাবে, বুঝে না বুঝে এই পরিবেশেরই ক্ষতি করি। পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ৫ই জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়। ১৯৭৪ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বর্তমানে পরিবেশ দূষণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অত্যধিকহারে গাছপালা কাটা, কলকারখানার বর্জ্য, যানবাহনের ধোঁয়া, প্লাস্টিক দূষণ, অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, অতিরিক্ত খনিজ উত্তোলন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। ফলস্বরূপ আমাদের জীবনধারণ হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। এর থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেতন হতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিবছরই বিশ্ব পরিবেশ দিবস ভিন্ন ভিন্ন শহরে, ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে পালিত হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সম্মেলন ও কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন, টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ দূষণের কারণগুলো চিহ্নিত করা, তা প্রতিরোধের উপায় নির্ধারণ করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রেখে মানুষ যেন অন্যান্য সমস্ত জীবের সাথে একাত্ম হয়ে এক সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকে — এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল লক্ষ্য। বিশ্ব পরিবেশ দিবস শুধু পরিবেশ রক্ষায় আমাদের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেয় না, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ বাসভূমি নিশ্চিত করার কর্তব্যকেও বোঝায়। আসুন এই বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পরিবেশ রক্ষায় একাত্ম হই।

প্রিয়াংকা হালদার
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ইবি।

৬. পরিবেশ বাঁচলে বাঁচবে পৃথিবী

পরিবেশ আমাদের জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমাদের চারপাশের সবকিছু মিলিয়েই গঠিত হয় পরিবেশ। পরিবেশ সুন্দর ও সুস্থ থাকলে আমাদের জীবনও হয়ে ওঠে সুন্দর, স্বস্তিদায়ক ও আনন্দময়। কিন্তু পরিবেশ যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন আমাদের জীবনেও নেমে আসে নানা সংকট ও দুর্ভোগ। বর্তমান সময়ে আমরা প্রকৃতির নানা বিরূপ আচরণের সম্মুখীন হচ্ছি, আর এর জন্য অনেকাংশেই দায়ী আমরা নিজেরাই। পরিবেশের প্রতি আমাদের অবহেলা ও অপব্যবহারের ফলেই আজ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কখনো তীব্র দাবদাহে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, বৃষ্টির দেখা মেলে না; আবার কখনো অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ বন্যা, যা মানুষের জীবন ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। কখনো কালবৈশাখী ঝড় ধ্বংস করে দেয় কৃষকের সারা বছরের ফসল, ঘরবাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ। আবার শীতকালে তীব্র শৈত্যপ্রবাহে অসহায় হয়ে পড়ে বহু মানুষ। তখন প্রশ্ন জাগে এসব কি শুধুই প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবর্তন, নাকি পরিবেশের প্রতি আমাদের অন্যায় আচরণের ফল? বাস্তবতা হলো, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, পরিবেশ দূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহারের মাধ্যমে আমরা নিজেরাই পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছি। এর ফলেই প্রকৃতি নানা দুর্যোগের মাধ্যমে আমাদের সেই কাজের প্রতিফলন দেখাচ্ছে। তাই আসুন, এই বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই পরিবেশ রক্ষা করব, বেশি বেশি গাছ লাগাব, দূষণ কমাব এবং একটি সুন্দর, সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করব। পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ, সচেতন ও সমৃদ্ধ সমাজ।

মো: জাহিদ হাসান
শিক্ষার্থী, আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইবি।

আরও খবর:

Sponsered content