বাংলাদেশ প্রতিদিন 7 February 2026 , 9:48:38
বাংলাদেশের লোকসংগীত অঙ্গনের প্রখ্যাত বাউল সাধক ও শিল্পকলা পদকপ্রাপ্ত শিল্পী সুনীল কর্মকার আর নেই। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই সন্তানসহ অসংখ্য ভক্ত, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে বাউল ও লোকসংগীত অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক।

২০২২ সালে লোকসংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তাঁকে শিল্পকলা পদকে ভূষিত করে। দীর্ঘ সংগীত জীবনে তিনি প্রায় দুই শতাধিক গান রচনা করেন এবং অসংখ্য জনপ্রিয় গানে কণ্ঠ দেন। বিশেষ করে বাউল মালজোড়া, মহাজনী গান ও গ্রামীণ লোকসংগীতে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। বিখ্যাত বাউল ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর গান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগীত জীবনে আত্মনিয়োগ করেন তিনি এবং পরবর্তীতে তাঁর অনেক গানে সুর ও কণ্ঠ প্রদান করে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সুনীল কর্মকার শুধু একজন শিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রামীণ ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক ধারার একজন গুরুত্বপূর্ণ বাহক। তাঁর কণ্ঠে মানবতা, জীবনদর্শন ও স্রষ্টার প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটত। একতারা ও দোতারার সুরে তাঁর পরিবেশনা শ্রোতাদের হৃদয়ে বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করত।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ফুসফুসজনিত রোগসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। শুক্রবার (৭ ফেব্রুয়ারি) ভোরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তাঁর মরদেহ নগরের আঠারোবাড়ি এলাকায় রাখা হয়েছে। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দুপুরে টাউন হল মাঠে নেওয়া হবে এবং পরে গৌরীপুর উপজেলার কলতাপাড়া এলাকায় তাঁকে সমাহিত করা হবে।
১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার বান্দনাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সুনীল কর্মকার। তাঁর পিতা দীনেশ কর্মকার ও মাতা কমলা কর্মকার। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। মাত্র সাত বছর বয়সে সংগীতচর্চা শুরু করেন তিনি। শৈশবে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারালেও সংগীত সাধনা থেকে বিচ্যুত হননি। বরং প্রতিকূলতাকে জয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন স্বনামধন্য বাউল শিল্পী হিসেবে।
কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনি যেমন জনপ্রিয় ছিলেন, তেমনি বেহালা, দোতারা, তবলা ও হারমোনিয়ামসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতেও ছিলেন দক্ষ। তাঁর ভরাট কণ্ঠ ও আবেগঘন পরিবেশনা যেকোনো সংগীত আসরকে প্রাণবন্ত করে তুলত।
ময়মনসিংহ জেলা বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আসলাম জানান, তাঁর মৃত্যুতে লোকসংগীত অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আজীবন সংগীতের মাধ্যমে মানুষের মাঝে মানবতা ও আধ্যাত্মিকতার বার্তা ছড়িয়ে গেছেন।

