Uncategorized

একটি হত্যা, বহু প্রশ্ন: হাদি হত্যার বিচার নিয়ে বুটেক্সের উদ্বেগ

  বাংলাদেশ প্রতিদিন 6 February 2026 , 11:55:26

শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের ৫৬ দিন পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সারাদেশের মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।

তারা মনে করছেন, এই হত্যার বিচার দীর্ঘায়িত হওয়া শুধু একটি ব্যক্তিগত হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতা নয়; বরং এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী স্বাধীনতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা তরুণ সমাজের নিরাপত্তা, দেশের ন্যায়বিচার ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।

ওসমান হাদি ছিলেন একজন প্রতিবাদী কণ্ঠ। তিনি দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এবং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ের চেতনাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে ধরে রাখার লক্ষ্যে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষার্থী সমাজের কাছে তিনি অন্যায় ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার কর্মকাণ্ড মূলত ফ্যাসিবাদ, ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে সমালোচনামুখর ছিল।

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ওসমান হাদির ওপর গুলি চালানো হয়। এতে তিনি নিহত হন। ঘটনার পরপরই দেশজুড়ে নিন্দা ও প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও এখনো বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় জনমনে হতাশা বাড়ছে। ওসমান হাদির খুনি এখনো পলাতক। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, হত্যাকাণ্ডের পরপরই খুনি ভারতে পালিয়ে যান। এমনকি বিভিন্ন ভিডিওতে তাকে ভারতে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। বুটেক্সের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই নীরবতা ও ধীরগতি তরুণ সমাজের মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করছে।

হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত—এ প্রশ্নের উত্তরে বুটেক্সের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সুলতান মাহমুদ বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আওয়ামী লীগ–ভারত নেক্সাসের ভূমিকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজনৈতিকভাবে পরাজয়ের পর প্রতিশোধপরায়ণ শক্তিগুলোর সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা বাস্তব। তিনি বলেন, বিচার প্রক্রিয়া যদি সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ডের মতো দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে, তবে দেশের প্রতিটি নাগরিক বহিঃশক্তির কাছে অনিরাপদ হয়ে পড়বে। তার ভাষায়, এটি শুধু একটি খুনের বিচার নয়; বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতার প্রশ্ন।

এদিকে, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় বুটেক্সের ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইমদাদ সরকার বলেন, ওসমান হাদি ছিলেন একজন সচেতন, সাহসী ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। তার মতো একজন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত। দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আল জাবের রাফি বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার না হলে শিক্ষার্থীদের আইনের ওপর আস্থা নষ্ট হয় এবং বিচারহীনতার একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। তিনি বলেন, ওসমান হাদির হত্যার বিচার না হলে ভবিষ্যতে এমন সহিংসতা আরও বাড়তে পারে, যা একটি ভয়ংকর নজির স্থাপন করবে। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে তার প্রধান দাবি হলো—এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং দেশের পক্ষে কথা বলা মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সম্প্রতি ওসমান হাদির পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ফ্ল্যাট ও নগদ এক কোটি টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গে বুটেক্সের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী শোয়াইব আল জান্নাত বলেন, পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া মানবিক হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই ন্যায়বিচারের বিকল্প নয়। তিনি বলেন, অর্থ দিয়ে দায় সারার চেষ্টা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে। হাদির ভাইকে কূটনৈতিক পদে নিয়োগ দেওয়ায় বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে তিনি মনে করেন। একজন জুলাই-পরবর্তী শিক্ষার্থী হিসেবে তার প্রধান দাবি হলো—ক্ষতিপূরণ নয়, বরং হত্যার দায়ীদের দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা।

ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, যা কেবল একটি রাজনৈতিক দল বা সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা বিভিন্ন ফ্যাসিবাদী টুল, ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেও এই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। তার মতে, জুলাই-পরবর্তী সময়ে সেই চেতনাকে যথাযথভাবে ধারণ করা যায়নি; ফলে আন্দোলনকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হাদি জুলাইয়ের চেতনাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন, যার ফলেই তিনি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। বিচার বিলম্বিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়, শোক ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে বলেও তিনি জানান।

বুটেক্সের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতে, ওসমান হাদির হত্যার বিচার নিশ্চিত করা এখন একটি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বিচার প্রক্রিয়ায় গতি না এলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ক্ষয়প্রাপ্ত হবে এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী কণ্ঠগুলো আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

আরও খবর:

Sponsered content