Uncategorized

সনদসর্বস্ব শিক্ষার বৃত্ত ভেঙে: লক্ষ্য হোক সুপ্ত প্রতিভার উন্মেষ ও মানুষ গঠন: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান

  বাংলাদেশ প্রতিদিন 20 May 2026 , 1:44:18

সমকালীন বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে প্রায়শই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সনদ লাভ কিংবা বৃত্তিমূলক কর্মসংস্থানের নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। শিক্ষার এই বাণিজ্যিকীকরণ ও সংকীর্ণ উপযোগিতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি মানবসভ্যতার মূল চেতনাকে ব্যাহত করছে। আমার দীর্ঘ একাডেমিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার আলোকে দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি- শিক্ষার প্রকৃত পরিধি ও উদ্দেশ্য এর চেয়ে বহুগুণ বিস্তৃত এবং গভীর। একে কেবল জীবিকা অর্জনের হাতিয়ারে রূপান্তর করলে শিক্ষার মূল লক্ষ্যই অপূর্ণ থেকে যায়। মহান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন যথার্থই বলেছিলেন, “শিক্ষা হলো এমন এক বিষয়, যা বিদ্যালয়ে শেখানো সব কিছু ভুলে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট থাকে।” অর্থাৎ, প্রকৃত শিক্ষা কোনো সাময়িক মুখস্থ বিদ্যা বা কাগজের সার্টিফিকেট নয়; এটি মানুষের মজ্জাগত সংস্কার।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শিক্ষার প্রকৃত সুফল এবং এর প্রায়োগিক ও নৈতিক সার্থকতা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের ‘ইসলামিক ইথিক্স’ বা ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতিশাস্ত্রভিত্তিক শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। যে শিক্ষায় নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার স্থান নেই, তা সমাজকে আলোর বদলে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। ইসলামের মহান নবী এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতির কল্যাণে প্রকৃত ও ফলপ্রসূ শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন। তিনি উম্মতকে এমন জ্ঞান অর্জন থেকে আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন যা কোনো উপকারে আসে না। তিনি প্রার্থনা করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান প্রার্থনা করছি এবং অপকারী জ্ঞান থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।” (সুনান ইবনে মাজাহ)। এই বাণী স্পষ্ট করে দেয় যে, যে শিক্ষার কোনো আত্মিক ও সামাজিক কল্যাণ নেই, যা মানুষের চরিত্র সংশোধন করে না, তা আসলে অর্থহীন।

ইসলামি নীতিশাস্ত্রভিত্তিক শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হলো ব্যক্তির ভেতর লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভার উন্মেষ ঘটিয়ে তাকে তাকওয়া বা খোদাভীতি এবং মানবিক গুণাবলীতে বলীয়ান করা। মনীষী স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়, “শিক্ষা হলো মানুষের অন্তর্নিহিত পূর্ণতার প্রকাশ।” প্রতিটি মানুষের মাঝেই এক একটি সম্ভাবনার বীজ নিহিত থাকে। প্রকৃত শিক্ষার কাজ হলো সেই সুপ্ত মেধা ও গুণাবলীর বিকাশ ঘটায়। এটি শিক্ষার্থীকে অন্ধত্ব পরিহার করে যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করতে শেখায়, নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে এবং সামষ্টিক কল্যাণে আত্মনিয়োগের মানসিকতা গঠনে উদ্বুদ্ধ করে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল দায়বদ্ধতা কেবল ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরম ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত পূর্ণাঙ্গ, সংবেদনশীল, বিবেকবান ও নৈতিক গুণসম্পন্ন বিশ্বনাগরিক (Global Citizen) তৈরি করা। দার্শনিক সক্রেটিস যেমনটি বলেছিলেন, “শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন এবং সত্যের আবিষ্কার।

”সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী ড. এ পি জে আবদুল কালাম বলেছিলেন, “শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো দক্ষতা ও দক্ষতার সাথে ভালো মানুষ তৈরি করা।” এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই জ্ঞান অর্জনের চরম সার্থকতা তখনই সাধিত হয়, যখন সেই জ্ঞান মানবকল্যাণ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে প্রযুক্ত হয়। আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমার উদাত্ত ও বিনীত আহ্বান- কেবল একাডেমিক ফলাফলের জিপিএ কিংবা সিজিপিএ অর্জনের অন্ধ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবেন না। ভালো ফলাফলের সমান্তরালে ইসলামি নৈতিকতার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে একজন দক্ষ ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হওয়ার ব্রত গ্রহণ করুন। কারণ, প্রায়োগিক উপযোগিতা এবং আত্মিক ও নৈতিক চেতনার সমন্বয় ছাড়া অর্জিত জ্ঞান সমাজ বা রাষ্ট্র- কারো পক্ষেই কল্যাণ বয়ে আনে না। আসুন, সনদসর্বস্ব শিক্ষার সংকীর্ণতা ভেঙে আমরা মেধা, মনন ও নৈতিকতার একীভূত বিকাশে সচেষ্ট হই।

আজকালের কন্ঠ/আর বি

আরও খবর:

Sponsered content